অহনা Ohona
এক.
আমার সাত বছরের মেয়ে পুতুল খেলতে খেলতে রিনরিনে স্বরে বললো,’সাথী আন্টি মারা যাবে। খুব বিশ্রী ভাবে মারা যাবে। ঘাড় ভেঙে,
পা থ্যাঁতলানো অবস্থায়। ‘
আমি সেলাই করছিলাম।
চমকে ওর
কথা শুনলাম।
মেয়েটা কথা বলে খুব কম। এখন কম
বলে। সাত মাস আগে অনেক কথা বলতো। হড়বড় করে বকবক চলতেই থাকতো। সারাদিন কথা বলতো। আমরা ওর কথার যন্ত্রণায়
অতিষ্ঠ হতাম।
ওর বাবা একদিন ওকে কথা বলার জন্য কঠিন ধমক দিলেন। সেদিন ও হাসি মুখে বললো, আর এক বছর কথা বলবো। তারপর, আর কোন দিন কথাই বলব না। ফারহান উঠে এসে ওকে চড় দিলো। চড় খেয়ে অহনার কোন বিকার হলো না। সে
আগের মতই ট্রেনের গতিতে প্রশ্ন করতে লাগলো,
‘আকাশ কেনো নীল। ‘হাতির দাঁতের রঙ সাদা না হয়ে গোলাপী হতে পারতো। হলো না কার জন্য। মশা সারাদিন কামড়ায়, রাতে মশা ঘুমাতে পারে কি?’ এইসব হাবিজাবি কথা।
কথার পিঠে উত্তর দিয়ে শেষ করা যায় না। অহনা নতুন কথা শুরু করে।
নিত্যনতুন প্রশ্ন জানতে চায়। এখন যেমন জানতে চাইছে, মানুষ অন্ধকারে কি
করে।
যথারীতি ওর দশটা প্রশ্নের একটা উত্তর দেয়া হয়। ফারহান এসবের ভেতর নেই।
ও আছে ওর তালে। অফিস-বাসা-ব্যবসা-অফিস। এই চতুর্ভুজে ফারহান ঘোরে। আমি আগে একটা স্কুলে চাকরী করতাম। ক্লাস সেভেনের ধর্ম শিক্ষক।
বাচ্চারা ধর্ম পড়তে চায় না। আমি গল্প বলে বলে ওদের পড়াতাম। শিশুদের আমার খুব ভালো লাগে। রাস্তায় ফকিন্নীর
কোলে শিশু দেখলেও আমার মায়া হয়। মনে হয়, আহারে, বাচ্চাটা জানেও না। ওর
মা ওকে পন্য বানিয়ে পয়সা রোজগার করে। আমাদের অহন ওখানেই পড়ত।এত কথার ভেতর দরকারী কথা হলো, এখন আমি চাকরী করি না। মানে অহনের রোগটা ধরার পর ছেড়ে দিয়েছি। অহনের খুব জটিল রোগ হয়েছে।
এক লক্ষ জনের ভেতর
একজনের হতে পারার চান্স থাকে। অহন জন্ম থেকে এই
চান্স নিয়ে জন্মেছে। রক্তের কঠিন অসুখ। রক্ত তৈরী হয় না, হলেও খুব কম। এতে আমাদের হাত নেই। ফারহান অহনের স্কুল বন্ধ করে দিলো। অসুস্থ মেয়ে স্কুলে গিয়ে কি হবে। আমি ফারহানের কোন কথায় কখনো প্রতিবাদ করি না। তাছাড়া, শুরুতে দেখতাম
চিকিৎসা খরচ অনেক। এখন আমরা অবশ্য হাসপাতাল থেকে ফ্রি ঔষধ পাই। ঔষধ কোম্পানি
এই রোগের ঔষধ আবিষ্কারের জন্য নিরলস কাজ করে চলেছে। অহন হয়েছে তাদের স্যাম্পল প্রোডাক্ট ফর টেস্টিং লিভিং অরগান বা
সোজা বাংলায় ‘ মানুষ গিনিপিগ।‘ বিষয়টাতে আমার মোটেও ইচ্ছা ছিলো না। অহন নিজে সম্মতি দিয়ে ওদের থেকে ঔষধ নিয়েছে। আর যাই হোক, আমার বাচ্চাকে
আমি গিনিপিগ বানাতে পারি ন।
অহনের স্কুলে বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল।
ছেলের সংখ্যা বেশি। মেয়ে কম কেন, অহনাকে জিজ্ঞেস
করলে মুখ টিপে হাসতো। পরে জানলাম, ছেলেরা নাকি তুলনামূলক ভাবে কম
ডেঞ্জারাস।
তবে, মেয়ে বন্ধুও ছিল। ওরা অহনের জন্য শেষ দিনও কেঁদেছে। ছেলেরা কেঁদেছে বেশি। অহনের মতে ছেলেরা সবাই ওকে সেইফ ভাবতো।
অহনের মত
ছয় বছর বয়সী মেয়ের মুখে এসব কথা নিতান্ত বেমানান। আমি অহনের বহু উদ্ভট কর্মকান্ডের সাক্ষী। আমার খারাপ লাগেনি। উদ্ভট কর্মকাণ্ডের দু'একটা উদাহরণ
দেই। যেমন ধরুন, যেখানে সেখানে হিশু করতে চাওয়া।
অহন ক্যারেক্টারলেস মানুষদের
কাছাকাছি থাকলে তাদের ওখানে হিসু করে। অহনের এই বিষয়টা আমি আগে বুঝতাম না। স্কুলের রিউনিয়ন উপলক্ষে টাকা জমা দিতে গিয়ে টের পেলাম। ক্যাশিয়ার বাকী ভাই এখনো আছেন।
তিনি আমাদের সময় থেকে নামকরা লুচ্চা। মেয়েরা একা গেলেই বুকে খামচি দেন। সুযোগ পেলে পায়জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিতে চান। আমার ওনাকে দেখে বমি পেলো। লোকটা একবার আমার পাছা কচলে দিয়ে ছিল।
বাসায় এসে কাঁদতে কাঁদতে জ্বর চলে এলেও কাউকে বলতে পারিনি। আম্মাকে বললে আম্মা বলতো, ‘তুই পাছা নাচাবি আর লোকজন না হাতায় থাকবে।
সব দোষ তোর। তোর পাছার দোষ। ‘ মুখ ঢেকে টাকা জমা দিতে গেলাম তাও বাকী ভাই
চিনে ফেললো। হাসি হাসি মুখ করে জানতে চাইলো, এখন কোথায় থাকি। জামাই কি করে। লোকটার
চোখ শরীর ঘুরে বেড়াচ্ছে টের পেয়ে বারবার ওড়না টানছি। খুচরা টাকা নিতে গিয়ে বাকী ভাই আমার হাত ধরে ফেললেন।
হাত ছাড়াতে যাব, অহন মিষ্টি গলায় বললো, ‘আম্মু,
আমি হিসু করে দিয়েছি।‘ কথাটায় বাকী ভাই যেমন চমকালো, আমি আতংক নিয়ে দেখলাম অহন বাকী ভাইয়ের চার্জে লাগানো মোবাইলের ওপর হিসু করে দিয়েছে। মোবাইল দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। অহন খুশিতে
লাফিয়ে লাফিয়ে বললো, ‘আম্মু, দ্যাখো দ্যাখো,
ভলকানো!’ বাকী ভাই আমার হাত ছেড়ে মোবাইলের দিকে দৌড়ে গেলো। অহনের হাত ধরে আমি দ্রুত পালিয়ে এলাম।
আসার সময় খেয়াল করলাম, অহন পেছন ফিরে বাকী ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে। অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা কৌতুক মিশ্রিত হাসি।
দুই.
ফারহানের সাথে আমার দেখাশোনার বিয়ে। বিয়ের আগে আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। ম্যারেজ মিডিয়া থেকে বায়োডাটা নিয়ে ওর মা প্রথমে
ফোন করলেন।
ফোন ধরলাম আমি। আমার শাশুড়ির
গলার স্বর কেমন ফ্যাসফ্যাসা হাঁস টাইপ ছিল। কথা বলার সময় মনে হতো ঠান্ডা লেগে আছে। উনি ‘হ্যালো’
বলেই জানতে চাইলেন, ‘এটা মনামীদের বাড়ি? মনামী এখন কোথায় আছে।‘
আমি খুবই অবাক হয়ে উত্তর দিলাম, ‘জি এটা মনামীদের
বাড়ি। মনামী এখন আপনার সাথে কথা বলছে। ‘ উনি একদম স্বাভাবিক ভাবে জানতে চাইলেন, আমার হাইট কত। গায়ের রং কেমন। আমার কোন ছেলে বন্ধু আছে নাকি।
ফোন রাখার পর আম্মা চড় দিলেন। যে
কেউ ফোন করে আমার পাছার রঙ জানতে চাইলেও
নাকি আমি বলে দেব, আমার পাছা শুকনো। হাঁটার সময় নড়ে না। গালে হাত দিয়ে টেলিফোনের পাশে বসে অনেকক্ষণ ভেবেছিলাম যে পাছার রঙের সাথে, হাঁটার সময় পাছা নড়ে কিনা তার রিলেশন কোথায়। আম্মা এমনি। কিসের সাথে কি মিলিয়ে কি বানিয়ে বলে দেন, তার ঠিক নেই। যেমন, পরের দিন যখন ফারহানের আম্মা বাসায় গাড়ি নিয়ে এলেন, আম্মা হাসতে হাসতে তাকে হাড়িভাঙা আম
খেতে দিয়ে বললেন, তিনি নাকি আমার ফোন রাখা দেখেই বুঝতে পেরেছেন, ছেলেপক্ষ
থেকে ফোন এসেছে। এবং ফোন করেছে ছেলের মা। নইলে, এত প্রশ্ন অন্য কেউ করে না। ফারহানের মা মুখ ভর্তি আম নিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলা দ্বিগুণ করে বললেন, ‘আপনি অনেক বুদ্ধিমতি। বুদ্ধিমতি মায়ের মেয়েরা বোকা হয়। আমার মেয়ে পছন্দ হয়েছে।‘
আমি আসলেই বোকা।
কারণ, অহন বলার পরেও আমি কখনো বুঝতে পারিনি যে ফারহান সাথীর সাথে নিয়মিত শুয়ে আসছে। স্বামীর পরকীয়ার খবর স্ত্রী টের না পেয়ে টের পেলো সাত বছরের অসুস্থ মেয়ে।
আমি বোকা না তো কি!
ফারহানের জন্য আমরা একদিন সেজেগুজে অপেক্ষা করছি। মাসে দুই বার আমরা চাইনিজ খাই। ফারহান কাজ শেষে গাড়ি করে আমাদের নিয়ে যায়। যাবার সময় অহনাকে ইউনিমার্টের মিনিসো
থেকে পুতুল কিনে দেয়া হয়। ফারহান খুব আনন্দ নিয়ে পুতুল কেনে। অহনার জন্য একটা পুতুল কিনলে ওর জন্যও মিনিসো থেকে কিছু নেয়। দামড়া বেটা মানুষের মিনিসো থেকে কি নেয়ার থাকে জানি না, আজব লাগে। আমরা একদিন ইউনিমার্টের উপরে শেফস টেবিলে সালাদ বার থেকে সালাদ খাচ্ছি। ওদিন চাইনিজে
যাওয়া হয়নি।
ফারহানের কি
যেনো কাজ আছে। আমাদের নামিয়ে
আবার অফিসে যাবে। অহনার জন্য চিকেন ফ্রাই নেয়া হয়েছে। অহনা চিকেনে কামড় দিয়ে বললো, ‘বাবা, তুমি যে কাজে যাচ্ছো, কাজটা হবে না।‘ ফারহানের হাত কেঁপে সালাদ জামায় পরে গেলো। চিকপিস সালাদের সাথে ও
নিয়েছে রাশিয়ান সালাদ। শার্টের ঠিক পেটের কাছে মাখামাখি অবস্থা। ফারহান প্রথমে সালাদ মুছলো।
তারপর, শার্ট ধুয়ে এসে বসে অহনার কাছে ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো, ফারহান কি কাজে যাচ্ছে এটা অহন জানে নাকি। অহনের চিকেন খাওয়া শেষ।
সে তখন কেক খাচ্ছে ।
কেক খেতে খেতে অহন বললো, ‘এই কেকটা নিয়ে যাও। আজকে সাথী আন্টির ছেলের জন্মদিন। ওনার স্বামী
বাড়িতে আছে। ‘ আমি দেখলাম,
ফারহানের হাতের কাঁটাচামচ কাঁপছে। অফিসের পাশে সাথীর বাসা।
ওরা ক্লাসমেট, এখন ব্যবসায়িক পার্টনার।
সাথীর বাসায় ফারহানের যাওয়া খুব স্বাভাবিক। এতে ওর হাত কাঁপবে কেন। অহনা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘মা, আমাকে সিনেমা
দেখতে নিয়ে যাবে? তুফান দেখব।
শাকিব খানের সিনেমা। ভারতীয় অভিনেত্রীর
একটা গানের জন্য এই সিনেমা হিট করবে।‘ আমি অহনের মুখের ওপর হাত চাপা দিলাম।
মেয়েটা অসুস্থ হবার পর পাগলের মত কথা বলে। একটা সাত বছরের বাচ্চা মেয়ের এডাল্ট মুভি দেখতে চাওয়া অস্বাভাবিক। মিমির গানটা আমি দেখেছি।
ইচ্ছেকৃত ভাবে জায়গা ঘোলা করে দর্শককে জোরপূর্বক নোংরা ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে। এদের আরো অশ্লীল খোলামেলা বিকিনি পরা ছবি ইন্টারনেটে নিজেদের পেজে, ইন্সটায় আপ্লোড করা থাকে। শুধু গানের ভেতর দেখা গেলেই দোষ। ফালতু পাব্লিসিটির ধান্দা।
ফারহান অফিসে গেলো না। ও
একটা ফোন করে এসে আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। আমাদের বাসাটা
তিন বেডরুমের।
একটায় আমরা থাকি। অন্য দুটো সাজানো থাকে।
ফারহানের মা
বেঁচে থাকতে উনি এসে থাকতেন।
আরেকটা অলিখিতভাবে ফারহানের
বড় বোনের।
উনিও ঢাকায় থাকেন। তবে, মাসের দশ এগারো দিন আমাদের এখানে ঘুরে যান। ঘুরে যান বলতে আসেন একদিন বিকাল বেলা।
এরপর রাত হয়ে গেছে বলে রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পরেন। পরদিন সকালে ওঠেন অনেক বেলা করে। উঠেই দোকানের পরোটা ভাজি আনার অর্ডার দিয়ে আবার শুয়ে পরেন।
দুপুরের আজান দিলে এক বারে গরম ভাতের সাথে মাংস, শুটকি এবং সকালে আনা পরোটা ভাজি খেয়ে বলেন, কইরে মনামী, আমাকে এক কাপ চা
দিবি না। খেয়ে চলে যাই। তোর হাতের চা খুব মজা। চা বানিয়ে
এনে দেখব, উনি আবার ঘুমিয়ে পরেছেন। সেই ঘুম ভাঙবে আবার পরদিন দুপুরে। এভাবে, একই নিয়মে তিনদিন পার করে দেবেন।
ওনাকে তৃতীয় দিন দেখতে আসবে ওনার ছেলে। সে
এসে থেকে যাবে। পঞ্চম দিন আসবে ওনার স্বামী। তিনিও এসে থেকে যাবেন।
এগারো দিনের দিন ওনারা বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে ড্রাইভারকে বলবে,
এই আমাদের বাসায় দিয়ে আসো।
যাবার সময় আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবেন, ‘আম্মা একটা রত্ন জোগাড় করে ছিলেন ফারহানের জন্য। আমার ভাইটা বেকুব, বেকুব। আস্ত বেকুব। বউয়ের কদর করে না।‘ ওনার স্বামী খুব দ্রুত মাথা নাড়িয়ে জানান দেবেন, যে ওনার স্ত্রীর
কথা একশত ভাগ ঠিক। কথায় কোন ভেজাল নেই।
যাবার আগে ওনার ছেলে এসে আমাকে সালাম করে দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রথম প্রথম বিয়ের পর
আমি বুঝতাম না। ফারহানের আম্মা আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন। ‘ওর হাতে একশটা টাকা দাও।
চলে যাবে।‘ আমি তখন নতুন বউ। পড়াশোনা করি। বিয়ে হয়ে এসেছি দুই দিন। হাতে টাকা আসবে কোথা থেকে। ফারহানের আম্মা আঁচ করে ঘরে গিয়ে টাকা এনে নাতির হাতে দিলেন।
ছেলেটা সুড়ুৎ করে চলে গেলো।
এরপর থেকে আমিও হাতে একশ টাকা রাখি। সালাম করলেই হাতে দিয়ে দেই। এবার দেখলাম,
একশ টাকা দেয়ায় নিতে চাইলো না। ছেলে কলেজ পাশ করেছে।
হয়ত টাকা বেশি চায়। আমি টাকা টেবিলের ওপর রেখে চলে এলাম।
এটা আমার চাকরী করে পাওয়া টাকার সুদের অংশ।
ফারহান সংসার খরচ বাদে একটা এক্সট্রা পয়সা আমাকে দেয় না। একশ টাকা যে দেই আমি, এই বেশি।
তিন.
অহনা পড়ালেখায় খুব ভালো। নিজে নিজে অংক বই
শেষ করে ফেলে আমাকে চমকে দিল। ফারহানকে দেখাতেই ও খুব উৎসাহ নিয়ে দেখে অনেকগুলো ভুল বের করেছে। অহনা ফারহানকের
কাছে স্কেল নিয়ে দেয়ায় আমি খুব আহত হলাম। ‘এটা কেনো আনলে, মা।‘ ‘কারন, বাবার মন চাইছে প্রতিটা ভুলের জন্য আমাকে স্কেলের বাড়ি দিতে।‘ ফারহান উঠে চলে গেলো। আমি অহনাকে একটু বকলাম।
বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলার অভ্যাসটা ওর বসে গেছে। খেতে বসে ফারহানকে সরি বললো অহনা। ফারহানও ওকে গাল টিপ আদর করে দিল।
তবে, ঘুমোতে যাবার আগে একটা উদ্ভট কথা বললো ফারহান। ওর নাকি সত্যি অহনাকে স্কেল দিয়ে মারতে মন চেয়ে ছিল। তারপর আমরা চাইনিজ খেতে গেলাম।
অহনা ফারহানকে কাজে যেতে মানা করলো। সাথীর ছেলের কথা বললো।
বাসায় ফিরে সেদিন ফারহান অহনার বালিশ ওর মায়ের ঘরে দিয়ে এলো।
এখন থেকে অহনা ঐ ঘরে ঘুমাবে। আম্মা যেহেতু
মারা গেছেন, তাই ঘরটা আম্মার জন্য সাজিয়ে রেখে লাভ নেই। অহনা থাকুক। বড় হচ্ছে মেয়ে। স্বামী-স্ত্রীর শোয়াশুয়ি ছাড়াও অনেক ধরনের আলাপ থাকে। এগুলো রাতেই হয়। বাচ্চাদের এসব শোনার দরকার নেই। অহনাকে বলতেই সে খুশী হয়ে লাফাতে লাফাতে রুমে চলে গেলো।
যেন, সে জানত এমন কিছু একটা হবে। ঐ
রাতে ফারহান নাক ডেকে ঘুমালো।
আমি অনেকবার উঠে উঠে অহনাকে দেখে এলাম। দুজনেই শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। আমি সারারাত এক ফোঁটা ঘুমাতে পারলাম না। কেমন খালি খালি লাগছিল। ভোর রাতে মেয়ের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলাম।
চোখ লাগার আগে শুনলাম, অহনা আমার গলা জড়িয়ে বলছে, ‘আমি জানতাম, তুমি আসবে মা।‘
সাথীর একটাই ছেলে, অটিস্টিক। আমার শাশুড়ী
বলতেন, বাপ মায়ের পাপে সন্তান খায়। আমি কথাটা বিশ্বাস করি না। সন্তান দেয়ার মালিক আল্লাহ।
অহনাকে তিনি নিজের হাতে আমাকে দিয়েছেন। অহনার রোগটার
কথা সাথী জানত না। ফারহান কথায় কথায় একদিন ওকে বলে দিলো।
সাথী পরদিন ছেলের হাত ধরে আমার বাসায় উপস্থিত।
এসেই কান্নাকাটির ঠেউ তুলে দিয়েছে।
ওরা দুইজন ফ্রেন্ড। দুজনের সন্তান
অসুস্থ ।
ওর ছেলে তাও বেঁচে থাকবে।
আমার মেয়ের সে সম্ভাবনা শূন্য পার্সেন্ট। মা কাঁদতে
কাঁদতে সাথীর ছেলে আমার চিনামাটির ফুলদানী ভেঙে ফেললো।
অহনের ড্রয়িং বুক ছিঁড়ে ফেলেছে।
বারান্দার গাছ উপড়ে দিলো। রান্নাঘরে গিয়ে বুয়াকে কামড়ে এলো। সাথী তার ছেলেকে একটুও ডাক দিলো না। বরং, অহনার দুঃখে কেঁদেই গেলো।
একটু পর, ছেলেটা অহনার রঙ
পেন্সিল মুচড়ে ভাঙতে গেলে অহন ওর হাতের কব্জি ধরে শক্ত অথচ সেই রিনরিনে মিষ্টি গলায় বললো,’ আর একটা জিনিষ নষ্ট করলে, আমি তোমার হাত ভেঙে ফেলবো।‘
ছেলেটা এই শুনে মেঝেতে হাত পা
ছড়িয়ে শুয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। অহনা কথা বলে বসে নিজ মনে কালার করছে। একটা টিয়া পাখি তার দুটি ছানাকে দানা খাওয়াতে উড়ে উড়ে আসছে। মুখে ঝুলছে একটা কিলবিলে কালো কুচকুচে কেঁচো।
রঙ করতে করতে অহান মুখ না তুলেই বললো,
‘মা, ওকে একটা কেঁচোর মত
লাগছে। দেখো, কেমন কিলবিল করছে।
এই কেঁচো, তুমি মিথ্যে ঢং
করো না
তো। ‘ সাথী সেই কথা শুনতে পেয়েই ছেলেকে হ্যাঁচকা টান মেরে মেঝে থেকে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো। আমরা অনেকটা সময় পর
দুপুরের ভাত খেতে বসলাম। সামান্য খাবার। মুরগীর মাংস পেঁপে দিয়ে, উপরে ভাজা জিরা ছেটানো, পাটশাক ভাজি, ঘণ করে পাঁচ মিশালী ডাল।
লবন-হলুদ দিয়ে বুট, মুশুর, মুগ, মটর আর খেসারীর ডাল প্রেসার কুকারে সিটি দিয়ে, রসুন পেয়াজ,
সামান্য আদা-রসুন বাটা, টমেটো কুঁচি দিয়ে বাগার দেয়া। মরিচের গুড়া দিতে হবে মশলা কষা কষা হলে। তখন সুন্দর
রঙ হয়। অহনার এই
ডাল খুব প্রিয়। সে এই ডাল দিয়ে ভাত মেখে খায়।
আমি খেতে খেতে অহনাকে বুঝিয়ে বললাম, সবার সামনে ওভাবে বলতে হয়
না। তাছাড়া, বাচ্চাটা অসুস্থ।
অহনা খেতে খেতে হেসে হেসে বললো, ‘মা তুমি কিছুই জানো না। ও মোটেও অটিস্টিক না। সাথী আন্টি মিথ্যা কথা বলে। ছেলেটা ছোট বেলা থেকে যা চেয়েছে, উনি তাই দিয়েছেন বলে ও এমন জেদ করে। এখন রোগের দোহাই দিয়ে সবাইকে ওর প্রতি সিম্প্যাথিটিক করে রাখে।
এটা তো
ঠিক না
মা! যারা সত্যি এই রকম, তারা তো ওর
থেকে আলাদা।
ওরা ভালো।‘
অহনা মাঝেমধ্যে খুব কঠিন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে। সে
নিজে নিজে ‘ফ্রেন্ডস’ দেখে। বদ
কিছু আসতে নিলে দুই হাতে চোখ ঢেকে জানতে চায়, ‘মা গিয়েছে?’ আমি ইংরেজি কম
বুঝি। ওকেও ইংরেজি বুঝিয়ে বলতে পারি না। অথচ, সে দিব্যি ইংরেজিতে
খবর শোনে, সিরিয়াল দেখে। আজব!
চার.
ফারহান তিনদিন পর
অহনাকে রুমে গিয়ে খুব ধমাকলো।
রেগে অস্থির হয়ে রুমে এসে আমার ওপর চোটপাট করে বললো, সাথী নাকি পার্টনারশিপ উইথড্রো করবে। ও পার্টনারশিপ
উইথড্রো করলে বিজনেসটা ফারহান একা চালাতে পারবে না। এর সব
কিছু হয়েছে অহনের জন্য। অহন যদি ঐ দিন সাথীর ছেলেকে কেঁচো না বলতো, তাহলে সাথী রাগতো না। ফারহানকে বুঝিয়ে আমি শান্ত করে পরের দিন সাথীর কাছে ক্ষমা চাইতে যাব ঠিক করলাম। ফারহানের অফিসের পাশের বিল্ডিং এ
সাথীর বাসা।
অফিসে গিয়ে দেখলাম ফারহান কেবিনে নেই। তখন দুপুরের
খাবার সময়।
অফিস একদম ফাঁকা। পিয়নটাও মনে হয় ওদের ডাইনিং এ ভাত খাচ্ছে। ফারহানের
টেবিলে খাবার রেখে সাথী বাসায় গেলাম। সাথীর বাসা ছয় তালা।
ইলেক্ট্রিসিটি নেই।
হেঁটে হেঁটে ছয় তালায় উঠে হাঁপিয়ে গিয়েছি।
সাথীর ছেলেটা হুট করে দরজা দিয়ে বের হয়ে সিড়ির স্পেসে একটা পিংপং বল নিয়ে খেলছে। ওকে পেছনে রেখে ঘরে ঢুকলাম। সাথীর বাসায় এই প্রথম আসা। আমাদের বাসায় ওদের অনেক বার দাওয়াত করে কোর্মা পোলাও খাওয়ালেও সাথী সবসময় রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। বাসায় নাকি ওর এত গেস্ট নিয়ে রাঁধার ঝামেলা ভালো লাগে না। সাথীর বাসায় অনেক গাছ পালা। এক জোড়া লাভ বার্ড ঝুলছে। ফারহান লাভবার্ড
খুব পছন্দ করে। আমি পাখি টাখি পালা দেখতে পারি না। ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।‘ সাথীর বেডরুম থেকে হুটোপুটির আওয়াজ পেলাম।
ও শুনেছিলাম বাসয় ‘জুম্বা’ করে। হয়ত এখনো ব্যয়াম করতে ব্যস্ত। দরজা ভেজানো ছিল। হাত ঠেলে উঁকি দিয়ে দেখি, সাথীর গায়ে একটা সুতোও নেই।
ওর শরীরের ওপর ফারহানের মিনিসো থেকে কেনা সমস্ত জিনিষ সাজানো। ফারহান একটা আন্ডায়ওয়ার পরে দাঁত দিয়ে ঐ
জিনিষগুলো একটা একটা করে তুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলছে আর সাথী শরীর দুলিয়ে খিলখিল করে হেসে তালি মারছে। ফারহান আবার হাউফ হাউফ করে ডাকছে, সাথী বলছে,
মিঁয়াও মিঁয়াও।
আমি ঠিক বুঝলাম না, বা বিশ্বাস
করতে পারলাম না আমি কি দেখছি। সাথীর ছেলেটা হঠাৎ পেছনে এসে বললো,’ ওদের এখন বিরক্ত করো না। বিরক্ত হলে ওরা খুব মারবে। মেরে মেরে মা আমার চামড়া তুলে ফেলবে।
তারপর বাবা আসলে বলবে, আমি তো অসুস্থ। তাই খেলতে গিয়ে পরে ব্যাথা পেয়েছি। তুমি চলে যাও। ওরা তোমাকে দেখতে পেলে মেরে ফেলবে। আর
কখনো এসো না। ‘
আমি ছুটে পালিয়ে এলাম। ফারহানের জন্য খাবার নিয়ে গিয়ে ছিলাম। মাঝ রাস্তায়
এসে মনে হওয়ায় আবার ফিরে গেলাম টিফিন ক্যারিয়ার আনতে। ফারহান কেবিনে
বসে খাবার খাচ্ছিলো। আমাকে দেখে খুব আমুদে গলায় বললো, ‘ডিম ভুনাটা
অনেক মজা হয়েছে। তুমি আম্মার
রান্নার অনেক কিছু শিখেছো। আপা কিছুই পায়নি'। আমি ক্লান্ত চোখে ফারহানের খাবার খাওয়া দেখতে লাগলাম। একটা লোক কতটা ভন্ড হলে এভাবে স্ত্রীকে দিনের পর দিন ধোঁকা দিতে পারে।
বাসায় ফিরে ভাত খেলাম না। শুয়ে শুয়ে কাঁদলাম। আসরের আযানের
পর অহন কি একটা মিষ্টি
গান গাইতে গাইতে রুমে ঢুকলো।
অযথা ড্রয়ার টানাটানি করলো। আমি ওকে ধমক দিতে গিয়েও দিলাম না। আমার এই
মেয়েটা বাদে আছে কে? অহন আমার কাছে বসে কপালে চুমু খেয়ে আবার ঐ কথাটা বললো, ‘সাথী আন্টি খুব বিশ্রী ভাবে মারা যাবে। মুখে রক্ত উঠে পরে থাকবে। মাছি ভনভন করবে। ‘
আমি অহনকে জড়িয়ে ধরলাম। মনে মনে বললাম, তাই যেন হয়। সাথী যেন এভাবে মরে যায়। অহন আমার কানে কানে বললো, ‘মা তুমি যা বলেছো, আবার বলো।‘ আমি আবার মনে মনে বললাম, ‘সাথী একটা নঢী মাগী। মাগী যেনো ঘাড় ভেঙে মরে।‘ অহন হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো, ‘মা নঢী মাগী কি খুব খারাপ কথা। এর
পুরুষলিঙ্গ কি
হবে? নঢা মাগা?’
আমি ভয় পেয়ে অহনকে ছেড়ে দিলাম।
অহন চুপচাপ দরজা ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় বললো, ‘ভয় পেয়ো না। বাবা ভালো হয়ে যাবে। ‘
অহনের মেয়ে ফ্রেন্ডের কথা বলেছি। সাথীর বিল্ডিংয়ে অহনের একজন ফ্রেন্ড থাকে। তার জন্মদিনে অহনকে দাওয়াত করেছে। অহন দাওয়াত
পেয়ে খুব খুশী। ওর শরীরের
অবস্থা তেমন ভালো নয়। দিনের অধিকাংশ সময় শুয়ে থাকে। নিজে টয়লেটে
যেতে পারে না। কোলে করে নিয়ে যেতে হয়। ফারহান সকালে অহনকে কোলে নিয়ে টেবিলে বসিয়ে দেয়। আমরা একসাথে
নাস্তা করি।
অহন বেশি কিছু খেতে পারে না। খাওয়া শেষ হলে আবার ফারহান ওকে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয়।
প্রতিবার এই
কাজটা করার সময় অহন ফারহানের গালে চুমু দিয়ে বলে, ‘থ্যাংকিউ বাবা'। আমি ফারহানের সাথে তেমন একটা কথা বলি না। ফারহানকে ছেড়ে যাওয়া গেলে চলে যেতাম। আমার বাবা একবার বিশাল অসম্মানজনক একটি কাজ করলেন। একজনের জমি নিজ নামে করে ফেললেন। লোকটা মামলা দেবে বলল, নয়ত নগদ জমির দাম। আমাদের হাতে তখন অত
টাকা নেই।
বাবা জমি ফিরিয়ে দিতে চাইলেন।
লোকটি রাজী হলো না। ফারহান তখন টাকাটা দিলো।
বাবার মৃত্যুশয্যায় বাবার মাথায় হাত রেখে আমি ওয়াদা করে ছিলাম, ফারহানকে কখনো ছেড়ে যাবো না। বাবা কেন তখন এই ওয়াদা করিয়ে ছিলেন খুব অবাক হয়ে ছিলাম।
এখন বুঝি, বাবা হয়ত ফারহানকে চিনতে পেরে ছিলেন।
বাবারা কখনো ভুল বোঝে না। তেমন বাবার মত বাবা হতে হয়। ফারহান অহনকে ঔষধ খাইয়ে দিতে গেলে অহন মুখ খুলছে না। ফারহান বিরক্ত হয়ে আমাকে ডাকল।
‘দেখে যাও।
এমন করলে হয়? ঔষধ না
খেলে ও
ঠিক হবে কিভাবে।‘
অহন খুব শান্ত ভাবে ফারহানের দিকে তাকালো। যেন স্বর্গ
থেকে আসা কোন ফুল ও
দেখছে।
‘বাবা তুমি মন থেকে চাইছো,
আমি ঔষধ খাই। ভালো হই। ঠিকাছে, আমি খাবো। তবে, এক শর্তে। আজকে বার্থডে পার্টিতে যাবার আগে আমাকে একটা হুইল চেয়ার কিনে দিতে হবে। আর তুমি মাকে সরি বলবে।‘
ফারহান চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বললো, ‘তোমার মাকে বেহুদা কারনে আমি সরি বলতে যাবো কেনো। সরি বলার মত আমি কি করেছি।‘
অহনা এত অসুখের মধ্যেও হাসছে। হাসতে হাসতে ফারহানের কোলে উঠে বললো,
‘সরি বলার মত অনেক কিছু করেছো বাবা।
তুমি সরিটা বলে দিও।‘
আমি ওদের কথা কানে তুলছি না। অহন কোন জামা পরে পার্টিতে যাবে দেখছি। পাতলা সুতি জামা আছে।
তবে, সেগুলো পার্টিতে
যাবার মত
না। অহনের জন্য জামা কিনতে হবে। ওর পার্টি
সু আছে লাল রঙের। ওগুলো ওর পায়ের মাপে হয় কি
না দেখতে হবে। মেয়ের মাথায় আমি একটা টায়রা দেব। ফেসবুকে ‘ড্রিমস
ক্লাব' নামের একটা পেজে এক
দামড়ি ইন্ফ্লুয়েন্সর মাথায় মুকুট পরে লাইভ করে। তার মাথায় নীল পাথর বসানো একটা মুকুট ভালো লেগে ছিল।
সেই মুকুট কিনতে হলে এখনি নিউমার্কেট যেতে হবে।
ওদের শো-রুম নিউমার্কেট। ফারহান আমার কাছে ক্ষমা চাইলো কি চাইলো না তাতে কিছু আসে যায় না। ফারহান সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম। এটা আমি জানতে পারি, বাবা মারা যাবার পর। অহনকে আমি ওকে উপহার দিয়ে ছিলাম। দেবশিশুটিকে সে ভালোবাসত না। এখন হয়ত বাসে অথবা করুণা করে। ফারহান আমাদের
তৈরী হতে বলে সাথীকে ফোন করেছে শুনলাম। ও
ফিরে এসেছে।
ভীষণ অপরাধী মুখ করে আমাকে অবাক করে বললো, ‘সরি মনামী। আমার ব্যবসাটা বোধহয় থাকবে না। সাথীর স্বামী ওদের নিয়ে বিদেশ চলে যাবে।
উনি চায় না, আমাদের পার্টনারশীপ থাকুক।‘
অহন আবারো হাততালি দিয়ে বললো, ‘কি মজা, কি মজা। সাথী আন্টির কেঁচো ছেলেটা বিদেশে যাবে। ও
বিদেশে গিয়ে একদম সুস্থ হয়ে যাবে বাবা। মা, আমরা কখন নিউমার্কেট যাবো?
আমি একটা লাল রঙের টায়রা কিনব। লাল জুতার সাথে ম্যাচিং লাল টায়রা। ‘ আমি খুবই ক্লান্ত ভাবে বললাম, ‘ যাব মা। এখনি যাবো।
আগে তোমাকে হুইলচেয়ার কিনে দেব।
তারপর যাবো টায়রা কিনতে।‘
অহনের এসব অতি আজব কথায় এখন আর আমি চমকিত হই না। মেয়েটা আমার চোখের সামনে মরে যাচ্ছে। আমি কিছুই করতে পারছি না। এর
থেকে বড়
ফেউলিওর হতে পারে না।
পাঁচ.
পার্টিতে অহন হুইলচেয়ার করে ইচ্ছে মত
ছুটোছুটি করছে।
ওর মাথায় ছোট ছোট লাল পাথর বসানো টায়রা।
মাঝের বড়
পাথরটা নাকি এ্যামেরিকান ডায়মন্ড কাটিং করা। দূর থেকে ঝিকমিক ঝিকমিক করে। আমরা নিউমার্কেট
গিয়ে একই সাথে জামা ও
টায়রা কিনে একটা মলের রেস্টরুমে অহনের ড্রেস বদলে সোজা পার্টিতে উপস্থিত হলাম। সাথীও এসেছে ছেলেকে নিয়ে।
ছেলেটা আজকে শান্ত হয়ে বসে আছে। ওর হাতে লাভবার্ডের খাঁচা।
আমাদের খেতে ডাকা হলো। তেহারী, রোস্ট, কোক। খাওয়ার পর কেক কাটা হবে। অহনকে আমি একটু মুরগী ছিঁড়ে খাইয়ে দিচ্ছি, সাথীর ছেলেটা খাঁচা খুলে পাখি ছেড়ে দিলো। সারা ঘরে পাখি উড়ছে, উড়তে উড়তে পাখি দুটো বেড়িয়ে গেলো।
কেউ একজন বললো, ওরা খুব বেশিদূর যেতে পারবে না। ছাদে গেলেই পাওয়া যাবে।
সাথী সাথে সাথে ছাদে চলে গেলো। অহন বললো,
পানি খাবে।
আমি পানি আনতে গেলাম। অহন একটু হালকা গরম পানি খায়। এ
বাসায় ওভেনের প্লাগ নষ্ট। চুলোয় গরম পানি হচ্ছে।
এমন সময় ধুপ করে একটা শব্দ পেলাম। সবাই বারান্দা দিয়ে দেখতে গেছে। চিৎকার চেচামেচি
শুরু হলো।
আমি গরম পানি নিয়ে এসে দেখি হুইল ফাঁকা, অহন নেই। ফারহান হয়ত ওকে কোলে নিয়ে কোথাও গেছে ভেবে বারান্দায় গিয়ে দেখি সবাই বিস্ফারিত চোখে নিচে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ ছুটে নেমে গেলো। ওদের ভেতর ফারহানকেও দেখলাম, তবে অহন কোলে নেই। আমিও নিচে তাকালাম। সাথে সাথে মাথা চক্কর দিয়েছে। সাথী ঘাড় ভেঙে নিচে পরা, ওর একটা পা বিশ্রী ভাবে থ্যাঁতলানো। পুরো মুখে রক্ত মাখামাখি, মাছি উড়ছে। আমি ছাদে দৌড়ে উঠলাম।
অহন ওখানেও নেই। দেয়ালের ধারে একটা বড়
লাল পাথর পরে আছে। পাথরটা নিয়ে হাতের মুঠোয় চেপে নিচে নেমে দেখলাম, অহন হুইল চেয়ারে বসা। সাথীর কেঁচো ছেলেটা আমার সামনে এসে অহনকে বললো, ‘থ্যাংকিউ’। আমি দাঁতের নিচে হাত কামড়ে ধরলাম। অহন আমাকে দেখে খুব রুগ্ন ভাবে হুইল ঠেলে এগিয়ে এসে বললো, ‘মা, পাথরটা আমার টায়রায় লাগিয়ে দেবে? টায়রাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
আমি কি
এটা আজকে সারাদিন পরে থাকতে পারি?’
*পরিশিষ্ট :
মনন আমাকে অবাক করে দিয়ে চার বছর বয়সে প্রথম কথা বলেছে। ওর
প্রথম কথা হলো, ‘অহন আপু তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। কিন্তু,
আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাবো না।‘ আমি দৌড়ে গিয়ে মননকে জড়িয়ে ধরলাম। অহন মারা যাবার পর
আমরা বসার ঘরে ওর একটা ছবি রেখেছি। এর
বাদে অহনের সব কিছু বিলিয়ে
দেয়া হয়েছে।
মননকে এক-দু’বার অহনের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে, ‘বড় আপু।‘
মনন চুপ করে ছিল। কিছু বলেনি,
জানতেও চায়নি।
বাচ্চাটা সময় পার হয়েও কথা বলতো না। অনেক ডক্টর দেখিয়েছি। সবাই বলেছে, ওর ভোকাল কর্ড সহ শ্রবণেন্দ্রিয়তে কোন সমস্যা নেই।
হয়ত কোন একদিন কথা বলবে।
পৃথিবীতে অসংখ্য মিরাকল ঘটে।
মননকে কনসিভ করাও তেমন মিরাকল। অহনের মৃত্যুর চারমাস পর
একদিন আমি পিরিয়ডের ডেট মিস করলাম। ফারহান সহ ডক্টরের কাছে গেছি। উনি গম্ভীর
মুখে সিনেমাটিক ভাবে বললেন, ‘কংগ্রেচুলেশন। আপনি মা হতে চলেছেন।‘
ফারহান হতবাক হয়ে জানতে চাইলো, এটা কি করে সম্ভব।
ডক্টর অত্যধিক আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘অসম্ভব মনে হবে কেনো? উনি কি
আপনাকে ছাড়া অন্য কারো সাথে শুয়ে বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে? ঘুরলে তো
আরো আগে ঘুরতে পারতো। এত
বছর পরে ঘুরবে কেনো। আল্লাহ চেয়েছেন, হয়েছে। এখন বাড়ি যান। স্ত্রীর যত্ন নিন।‘
ফারহান যোগ্য স্বামীর মত, ভালো বাবার মত আমাকে সেবা করেছে। বমি করলে পরিষ্কার করে ডিম পোচ করে এনে বলেছে, ‘খাও, নইলে দূর্বল হয়ে যাবে। আমাদের বাবুর গ্রোথ হবে না।‘ মনন আমাদের
সেই পরম আকাঙ্খার সন্তান।
ওকে বুকে নিয়ে জানতে চাইলাম, এতদিন ও কথা বলেনি কেন। মনন আমার বুকে মুখ লুকিয়ে উত্তর দিল, তার ইচ্ছে হয়নি তাই বলেনি। আজ
ইচ্ছে করেছে, তাই কথা বলেছে।
আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম, ‘তুই অহনকে চিনিস?’ মনন এবার মুখ তুলে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো, ‘অহন আপু আমাকে বলেছে, ও তোমার নিজের মেয়ে ছিলো না। আমি তোমার নিজের ছেলে তাই, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। ‘ মনন খিলখিল
করে হাসতে লাগলো। ওর লাল গাড়িটা ঘরময় লুয়ালুয়া শব্দ তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অহন আমার বড় বোনের নাপাক সন্তান ছিল।
দুলাভাইয়ের সাথে রাগ করে দেশে চলে আসার এক
সপ্তাহের মাথায় আমাকে জানালো সে
এক মাসের প্রেগন্যান্ট। বাচ্চাটা দুলাভাইয়ের না,
আপার সেক্স পার্টনারের। সেক্স পার্টনার
মানে, মন চাইলে তার সাথে সেক্স করা যায়।
আমি ভয়
পেয়ে আঁতকে উঠলাম। বোন ভাবলেশহীন
গলায় বললো, ‘পার্টনার শ্বেতাঙ্গ। বাচ্চাটা হলে তোর দুলাভাই বুঝে যাবে, এটা ওর না। আমার বড় বড় মেয়েরা
আছে। ওদের ভবিষ্যৎ আমার সেক্স ডিজায়ারের জন্য নষ্ট হতে পারে না। তাই ঝগড়ার নাটক করে চলে এলাম। ‘ নয়
মাসের মাথায় বোন বাচ্চা জন্ম দিয়ে আমার কোলে তুলে চলে গেলো। সবাই জানলো, আমরা একটা বাচ্চা দত্তক নিয়েছি।
অহন ওর
জন্মের বিষয়টা হয়ত কোনভাবে বুঝে গিয়ে ছিল। তাই, বাচ্চা মেয়েটা ক্যারেক্টারলেস লোকজনের
কাছাকাছি থাকলে টয়লেট করে দিত।
মননকে শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে রাখলাম। আহারে, আমার ছোট্ট মেয়েটা বুক ভর্তি কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। অদেখা দূয়ারের অপর প্রান্তে সে হাজার হাজার ফুল বাগানের একটি নিষ্পাপ ফুল হয়ে ফুটে থাক।
মনন চুপিচুপি আমার বুকে মুখ গুঁজে রেখেই বললো, ‘আপু ভালো আছে মা। খুব ভালো আছে।‘
0 comment: